রক্তচাপের দৈনিক ছন্দ

–        ডাঃ এ, আর, এম, সাইফুদ্দীন একরাম

পৃথিবীতে সব কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম এবং ছন্দ মেনে চলে। রাতের পরে দিন আসে, দিনের পরে রাত। সাগরে নির্দিষ্ট নিয়মে জোয়ার ভাটা আসে, বাৎসরিক ঋতুচক্রেও আমরা দেখি ছন্দময় চক্র। তেমন আমাদের দেহ ঘড়িতেও রয়েছে ছন্দ। হৃদ ঘাত, নাড়ির গতি কিংবা ঘুমের মতো রক্তচাপেরও একটি দৈনিক ছন্দ রয়েছে। সাধারণত রাতে ঘুমের সময় রক্তচাপ কম থাকে। কিন্তু ভোরে ঘুম থেকে ওঠার ঘণ্টা খানেক আগে থেকে রক্তচাপ বাড়তে থাকে।  দিনের বেলা রক্ত চাপ বাড়তে থাকে এবং বিকেল বেলা এটা সব চেয়ে বেশী থাকে। বিকেলের পর থেকে রক্তচাপ আবার কমতে থাকে। কারও রক্তচাপের ছন্দে  অস্বাভাবিকতা থাকলে (যেমন সকাল বেলা যদি রক্তচাপ বেশী থাকে), তার অন্তর্নিহিত কোন গুরুতর ব্যাধি থাকার আশঙ্কা বেশী থাকে।

সাধারনত নানারকম অসুখের কারণে এরকম হতে পারে । কারও রক্তচাপ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তার রক্তচাপের নিয়মিত ছন্দ বিঘ্নিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রক্তচাপের কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নানা রকম গুরুতর ব্যাধির কারণে এমন হতে পারে। যেমন- কিডনির রোগ, শরীরে হরমোনের সমস্যা, মস্তিষ্কের কিংবা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির টিউমার ইত্যাদি। এছাড়া রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত সেবন না করলেও এমন হতে পারে।

অনেকের রাতে ঘুমের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।একে নিদ্রাজনিত শ্বাস-আবদ্ধতা বলা হয়। এভাবে রাতে মাঝে মাঝে শ্বাস বন্ধ থাকার কারণে রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ফুসফুসের রক্তনালির চাপ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন হতে থাকলে এদের উচ্চরক্তচাপ হওয়ার প্রবণতা থাকে। এছাড়া এধরনের সমস্যার জন্য রাতের ঘুম বিঘ্নিত হয় এবং দিনে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব থাকে এবং শারীরিকভাবে অবসন্ন বোধ হয়।

রক্তচাপের ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ার পেছনে অনেক ঝুঁকি উপাদান কাজ করে। যেমন-

  • রাতের শিফটে কাজ করা – মনে করা হয় যারা দিনের শিফটের  পরিবর্তে রাতের শিফটে কাজ করেন তাদের ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বিঘ্নিত হয়। এদের এক পর্যায়ে রক্তচাপের ছন্দ বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • ক্যাফেইনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলেও রক্ত চাপের ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে।
  • অতিরিক্ত বিড়ি, সিগারেট, তামাক ইত্যাদি  সেবন করলে রক্তনালি সঙ্কুচিত হয় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়। এভাবেও রক্তচাপের দৈনিক ছন্দ বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • অতিরিক্ত উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, মানসিক অশান্তির কারণে রক্তচাপের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে।

উচ্চরক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চরক্তচাপের কোন লক্ষন-উপসর্গ থাকে না।  সাধারণত উচ্চরক্তচাপের রোগীদের গুরুতর জটিলতা হওয়ার পরে অতিরিক্ত রক্তচাপের বিষয়টি শনাক্ত হয়। তেমন রক্তচাপের দৈনিক ছন্দ বিঘ্নিত হলেও তা দীর্ঘদিন চাপা থাকতে পারে । একমাত্র এর ফলে জটিলতা হলেই তা শনাক্ত হয়। আর সাধারণ পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা এটা শনাক্ত করাও যায় না। এজন্য ২৪ ঘণ্টা রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করলে রক্তচাপের দৈনিক ছন্দে কোন সমস্যা আছে কিনা , তা বের করা হয়। অতএব কারও রক্তচাপের ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে এবং এজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s