আলঝিমারস রোগঃ বৃদ্ধ বয়সের বুদ্ধিবৈকল্য

মানুষের বয়স বাড়লে স্মরণ শক্তি কমে যায়। বয়স চল্লিশের কথা পেরুলেই বিশাল অংশের একদল লোকের স্মরণ শক্তি কমে যেতে শুরু করে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে সব কিছু ভুলে যাবার প্রবণতা। এই ধরণের বুদ্ধিবৈকল্য বা স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়ার কারণ যে সকল রোগ, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে আলঝিমারস রোগ। ১৯০৬ সালে জার্মান মনোচিকিৎসক A. Alzheimer সর্বপ্রথম এ রোগটির বর্ণনা দেন। তার নাম অনুসারেই এ রোগের নাম রাখা হয়।

এ রোগের সঠিক কারণ কি তা কিন্ত এখন ও জানা যায়নি তবে সাম্প্রতিক গবেষনা গুলো দাবী করছে; যে সকল উপাদান বা নিউরোট্রান্সমিটার এর আদান প্রদান এর মাধ্যমে মস্তিস্ক তাদের কার্য সম্পাদন করে তাদের সমস্যার কারণেই এই রোগটি হয়ে থাকে। পরিসংখান অনুযায়ী শতকরা ১৫ ভাগ রোগীই এ রোগে আক্রান্ত হন পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে, আর শতকরা ১ থেকে ৫ শতাংশ রোগের কারন হলো জেনেটিক। এ রোগ হলে মস্তিস্কের আয়তন সঙ্কুচিত  হয়ে আসতে থাকে, বিশেষ করে সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং হিপোক্যাম্পাস উল্লেখযোগ্য ভাবে আকারে কমতে থাকে।

আগেই বলেছি আলঝিমারস রোগ হলে রোগীর স্মৃতি শক্তি কমে যেতে শুরু করে। রোগী সাম্প্রতিক (short term) এবং অতীত (long term) দুই ধরণের স্মৃতিই হারিয়ে ফেলেন।  যদিও সাম্প্রতিক ঘটনা গুলো ভুলে যাবার হারটাই অধিক। এছাড়া এ সকল রোগীর মাঝে বিভ্রান্তি , খিটখিটে স্বভাব, আক্রমণাত্মক মনোভাব , বিষন্নতা-অবসাদ, বাকশক্তিহীনতা বা অন্যের কথা বোঝার ক্ষমতা লোপ পাওয়সহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তিনি তার এই সমস্যাগুলো বুঝতে পারেন না । এমন কি তার মনে এ বিশ্বাস জন্মায় যে তার এ ধরনের কোন সমস্যাই নেই। এর ফলে অনেক সময়ই ব্যক্তিটি পারিবারিক ভুল বোঝাবুঝির শিকার হন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তার একটি বৈরি সম্পর্ক তৈরী হয়। ফলে  তিনি চরম একাকীত্বে ভুগতে থাকেন।

এমন রোগ হলে পরিবারের প্রবীণ সদস্যটিকে একজন বিশেষজ্ঞের নিকট নিয়ে যাওয়া উচিত। সাধারণত চিকিৎসক সাহেব রোগীর ইতিহাস জেনে এবং তার আত্মীয়দের সাথে কথা বলেই রোগটি নিশ্চিত করতে পারেন। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় নানাবিধ ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন- এম,আর,আই,  (MRI), স্পেক্ট (SPECT-single photon emission computed tomography), পেট স্ক্যান (PET-positron emission tomography) ইত্যাদি।

দুর্ভাগ্যজনক হলো আলঝিমারস রোগের এখনো সঠিক কোন চিকিৎসা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে পরিবারের আপনজনেরা সহানুভুতিশীল হলে এবং সহমর্মিতা সহ ব্যক্তিটিকে একটি সঠিক স্নেহময় পরিবেশ তৈরী করে দিলে তার জন্য একটি অর্থবহ জীবন যাপন সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে।

বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, যেসকল ব্যক্তি মধ্যবয়সে বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক কাজ (যেমন লেখালেখি, বইপড়া, যন্ত্রসংগীত বাজানো), বিভিন্ন সামাজিক গঠন/সেবামূলক কাজ, বুদ্ধির খেলা যেমন- দাবা  ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খান তাদের এ রোগ হবার প্রবণতা কম। অন্যদিকে যারা অনিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ রোগে ভুগেন বা ধূমপায়ী তাদের মধ্যে এ রোগ হবার প্রবণতা অপেক্ষাকৃত ভাবে বেশী।

সম্প্রতি আলঝিমারস  রোগের উপশমে নতুন কিছু ওষুধ আবিস্কৃত হয়েছে। এদের কার্যকারীতা শতভাগ না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এরা রোগ উপশমে ভূমিকা রেখেছে। তবে বাস্তবতা হলো এই যে বার্ধক্যে উপনীত হলে আমরা যে কেউই এমন একটি রোগের শিকার হয়ে উঠতে পারি, তাই আমাদের সকলের উচিত এমন রোগীদের সহানুভুতির দৃষ্টিতে দেখা এবং আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটা সুন্দর  পৃথিবীর পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়াস অব্যাহত রাখা।

Advertisements

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ

সবাই চায় আধুনিক জীবনের ইঁদুরদৌড়ে এগিয়ে থাকতে ।  আর এই তাড়না থেকে জীবনের প্রতিকুল পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেবার জন্য মানুষের শরীর ও মনে নানারকম পরিবর্তন ঘটে।  কোন হুমকি বা চ্যালেঞ্জের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবার সময় আমাদের মন ও শরীরের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয় । এর ফলে সৃষ্টি হয় মানসিক চাপ কিংবা উদ্বেগ। পরিমিত উদ্বেগ আমাদের প্রতিকুল পরিবেশকে মোকাবেলা করতে সাহায্য করে । কিন্তু অতিরিক্ত মানসিক চাপ আমাদের দেহ ও মনে খারাপ প্রভাব ফেলে । অতিরিক্ত উদ্বেগ এবং মানসিক চাপ হলে আমাদের দেহের বিভিন্ন স্ট্রেসর হরমোন (এড্রিনালিন, নরএড্রিনালিন) এর পরিমানগত তারতম্য দেখা দেয়, নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণে পরিবর্তন ঘটে – যার প্রভাব পড়ে দেহ ও মনে। এ সময় আমাদের হৃৎপিন্ডের গতি ও রক্তচাপ বেড়ে যায় (প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য মাংসপেশী , মস্তিষ্ক ও হৃৎপিন্ডে বেশি রক্ত সরবরাহ করার জন্য), শ্বাস প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি পায় (শরীরে বেশী অক্সিজেন নেবার জন্য), মাংসপেশী  দৃঢ হয়ে উঠে (প্রতি আক্রমণ ঠেকানো বা আক্রমণ করার জন্য), মানসিক সতর্কাবস্থা বেড়ে যায়, এমনকি আসন্ন বিপদে রক্তক্ষরণ হতে পারে এ আশংকায় রক্ত জমাট বাধার উপাদানগুলো বৃদ্ধি পায়। এরকম স্ট্রেস অবস্থাকে এক কথায় বলা হয়-  “লড়ো অথবা পালাও প্রতিক্রিয়া বা fight or flight reaction”।

সব বয়সেই উদ্বেগ বা মানসিক চাপ হতে পারে । তবে মধ্যবয়সে যে সমস্ত কারণে স্ট্রেস হয় তার মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে – অতিরিক্ত কাজের চাপ ও কর্মক্ষেত্রের  প্রতিকুল পরিবেশ। এছাড়া – শব্দদূষণ, ভীড়, একাকীত্ব, ক্ষুধা, প্রিয়জনের মৃত্যু, নিরাপত্তাহীনতা, পারিবারিক সমস্যা, বিবাহ বিচ্ছেদ, ঘুমের সমস্যা, ক্যফেইন যুক্ত পানীয় গ্রহণ বা নানা ধরণের শারীরিক অসুস্থতার জন্য মানসিক চাপ বেড়ে  যেতে পারে। যাদের ব্যক্তিত্ব টাইপ-এ অর্থাৎ যারা উচ্চাকাংক্ষী, পেশাগত অর্জনের জন্য উদগ্রীব , কাজ পাগল (workaholic), সহজেই যাদের  ধৈর্য্য হারায় , যারা সবসময় প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব পোষেন, তাদের মানসিক চাপ বেশী থাকে।

দীর্ঘদিন মানসিক চাপ এবং উদ্বেগে ভুগলে শারীরিক ও মানসিক দুধরণের সমস্যাই হতে পারে ।  বিশেষত মধ্য বয়সে এ ধরণের সমস্যা বেশী হয়। মাথা ব্যথা, ঘুমের ব্যঘাত, বমিভাব, অতিরিক্ত ঘাম, নির্জীবতা থেকে শুরু করে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কিডনীরোগ, উচ্চরক্তচাপ ও স্ট্রোক হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। মানসিক সমস্যার মধ্যে দেখা যায় – কাজে অমনোযোগিতা, সহকর্মী-অধস্তন বা উর্ধতন সহকর্মীদের সাথে সম্পর্কের অবনতি, সিদ্ধান্তহীনতা, হঠাৎ রেগে যাওয়া, বিষন্নতা, উৎকন্ঠা, অসহনশীলতা, হতাশা, দাঁত দিয়ে নখ কাটা, পা নাচানো ইত্যাদি। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে কর্মদক্ষতা কমে যায় – সৃষ্টিশীলতা ব্যাহত হয় এবং এর প্রভাব পড়ে ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজে ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক সমীক্ষায় দেখা যায় – শতকরা ৪০ ভাগ কর্মী জানিয়েছেন তাদের কাজ ও কর্মক্ষেত্র উদ্বেগপূর্ণ। আমাদের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে এ হার আরো বেশী হতে পারে। কর্মক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর কারণে বেশী উদ্বেগ সৃষ্টি হয় তাহলো –

  • চাকরী ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা
  • কর্তৃপক্ষের উচ্চাভিলাষী কার্যক্রম
  • কাজে অসন্তুষ্টি
  • চাহিদার তুলনায় বেতন কম
  • কর্তৃপক্ষ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে খারাপ সম্পর্ক
  • রাত জেগে কাজ করা
  • অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হওয়া
  • পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা
  • অতিরিক্ত উচ্চাকাংক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব
  • কর্মক্ষেত্রে দুর্নীতি
  • মাদকাসক্তি
  • মানসিক বা শারীরিক রোগে আক্রান্ত হওয়া
  • কর্মক্ষেত্রে আবেগজনিত সম্পর্ক তৈরী হওয়া। 

কর্মক্ষেত্রে উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মানের পরিবর্তন করার পাশাপাশি উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়ার কারণ চিহ্নিত করতে হবে আর পরিবর্তন করতে হবে দৃষ্টিভংগির। এজন্য নীচের বিষয়গুলির প্রতি খেয়াল রাখলে উপকার পাওয়া যাবে-

  • কাজের লক্ষ্যগুলি আগে ঠিক করতে হবে। গুরুত্বপুর্ণ বিষয়গুলোকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তখন দেখা যাবে পুনর্বিন্যাসের আগে যা এক নম্বর গুরুত্বপুর্ণ বোধ হচ্ছিল তার চাইতে গুরুত্বপুর্ণ কিছু বিষয় বের হয়ে এসেছে, এবং যা উদ্বেগ সৃষ্টি করছিল তা অনেকাংশে কমে গেছে।
  • সহজপাচ্য কম চর্বিযুক্ত খাবার, ফল ও আঁশযুক্ত খাবার খাদ্যতালিকায় রাখা ভালো। খাবার তালিকায় অতিরিক্ত ভাজা-পোড়া তেল বর্জন করতে হবে।  
  • নির্দিষ্ট সময়ে খেতে হবে।  কাজের তাড়ায় সকালের নাস্তা যেন বেলা এগারোটায় আর লাঞ্চ যেন বিকাল পাঁচটায় না খেতে হয় সেদিকে নজর দিতে হবে । অফিসে দেরী হবে এই ভয়ে পানি দিয়ে গিলে খাবার খাওয়া যাবে না- সময় নিয়ে উপভোগ করে খাবার গ্রহণ করতে হবে ।
  • ক্যাফেইনযুক্ত (চা, কফি, কোলা) পানীয়, ধূমপান ও মদ্যপান বর্জন করতে হবে।
  • প্রতিদিন নিয়মিত কিছু হালকা ব্যায়াম  বা শরীর চর্চা করতে হবে। অন্যথায়  প্রতিদিন অন্তত ৪৫ মিনিট হাঁটতে হবে।
  • প্রতিদিন কিছু সময় যোগব্যায়াম, শিথিলায়ণ কিংবা ধ্যান চর্চা করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। 
  • নিয়মিত  প্রয়োজনমতো ঘুমাতে হবে । ভালো ঘুম উদ্বেগ দূর করার জন্য খুবই কার্যকরী ।
  • নিজের ও পরিবারের জন্য কিছু সময় রাখতে হবে।  প্রিয়জনদের নিয়ে বছরে অন্তত দুয়েক বার কোথাও থেকে বেড়িয়ে আসা ভালো।
  • আয়ের সুষম বন্টন ও ব্যয়ের বাহুল্য খাতকে সংকুচিত করে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে হবে।
  • সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা ক্ষতিকর।  হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে , প্রয়োজনে নির্ভরশীল কারো সংগে পরামর্শ করা উচিৎ।
  • জীবনে চলতে গেলে যে সমস্যা আসবে তার প্রতি ক্ষোভ কিংবা আক্রমণাত্মক  মনোভাব দেখানো ঠিক নয় ।  হতাশ না হয়ে সমস্যাটি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং  বিকল্প সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
  • কোন চাকরী গ্রহণ বা ছাড়ার আগে, নতুন কোন সম্পর্ক তৈরী বা ভাঙ্গার আগে বাস্তব ও যুক্তিগ্রাহ্য সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবসময় আবেগ দ্বারা চালিত হলে সমস্যার সমাধান হবে না ; বরং জটিলতা বাড়বে।
  • জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভংগি গড়ে তুলতে হবে। সবকিছুর মধ্যে যেটা  ভাল তার দিকে মনোযোগ দেয়ার অভ্যাস করতে হবে।
  • একটি কাজে সফল হতে না পারলেই হতাশায় ভেংগে পড়া চলবে না। ভাবতে হবে সামনে আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে, সেখানে সফল হওয়ার আশা পোষণ করতে হবে।
  • হাসতে হবে। প্রতিটা বিষয়ে হালকা দিক নিয়ে নিজের ভেতর রসবোধ তৈরী করার চেষ্টা করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে গম্ভীর না থেকে – নিজে হাসুন, অন্যকে হাসানোর চেষ্টা করতে হবে।
  • শারীরিক রোগ যেমন – ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির জন্য নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহন করতে হবে এবং রোগগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। 
  • কর্মক্ষেত্রে অযথা মুরুব্বিয়ানা দেখানো কিংবা সব কাজে খুঁত ধরা ভালো নয় । সহনশীল হতে হবে এবং ভালো কাজের প্রশংসা করতে হবে।
  • অফিসে ভালো বন্ধু গড়ে তুলুন- তার সাথে অফিসের বিষয়াদি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। ‘কর্পোরেট পলিটিক্স’ এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ।
  • অপ্রয়োজনীয় কাজে অফিসে সময় নষ্ট করা মোটেও উচিৎ নয়। কখনই অন্যের সমালোচনা কিংবা নিন্দা করা উচিৎ নয়।
  • কাজের ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিণতির দিকে নজর দিতে হবে এবং অন্যদেরকেও  সেদিকে নজর দিতে উৎসাহিত করতে হবে।
  • কর্মক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়গুলো উদ্বেগ সৃষ্টি করছে সেগুলো চিহ্নিত করে  সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।  প্রয়োজনে পরিবার কিংবা  সহকর্মীর সাহায্য নিতে হবে।

আমাদের দেশেও বর্তমানে কর্পোরেট বানিজ্যের জগৎ প্রসারিত হয়েছে।  মুক্তবাজারে দ্রুতগতিতে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ। দেশীয় কর্পোরেট এক্সিকিউটিভরা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বহুজাতিক কোম্পানীতে শক্ত অবস্থান করে নিচ্ছেন, পাশাপাশি দেশী প্রতিষ্ঠানগুলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলির সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি।    কিন্তু কর্মক্ষেত্রে উদ্বেগ নিয়ন্ত্রনের বিষয়টি এখনো তেমন গুরুত্বপূর্ণ  হয়ে উঠেনি । উন্নত বিশ্বে কর্মক্ষেত্রের উদ্বেগ বা  স্ট্রেস নিয়ন্ত্রনের জন্য বেশীরভাগ কোম্পানীতে রয়েছে বিশেষ পরামর্শের আয়োজন । গড়ে উঠেছে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার।  আমাদের দেশে এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এখনো সেরকমভাবে গড়ে উঠেনি। কিন্তু কর্মস্থলে কর্মীদের  মানসিক চাপ মুক্ত রেখে স্বাস্থ্যকর কর্মক্ষেত্র তৈরী করা উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ।

হাসতে নেই মানা

বাংলা সাহিত্যে মজার জগতের কারিগর সুকুমার রায় লিখেছিলেন-

রাম গড়ুরের ছানা হাসতে তাদের মানা,

হাসির কথা শুনলে বলে,

‘হাসব না-না, না-না’।

সদাই মরে ত্রাসে-ঐ বুঝি কেউ হাসে।

এক চোখে তাই মিট মিটিয়ে

তাকায় আশেপাশে।

ঘুম নাহি তার চোখে, আপনি বঁকে বঁকে

আপনারে কয়, ‘হাসিস যদি

মারব কিন্তু তোকে।’

যায় না বনের কাছে, কিংবা গাছে গাছে,

দখিন হাওয়ার সুড়সুড়িতে

                                              হাসিয়ে ফেলে পাছে।                            (সংক্ষেপিত)

হাসি সম্পর্কে এত সুন্দর প্রকাশ কমই দেখা যায়। বিশ্ব সাহিত্য কিংবা চিত্র শিল্পকর্মেও হাসি নিয়ে আমরা নানা রকম অমর সৃষ্টি দেখি। মোনালিসার হাসি নিয়ে যেমন গবেষণা এখনো শেষ হয়নি, তেমনি অনেক জানার বাকি ক্রীতদাসের হাসি সম্পর্কে। কিন্তু হাসির ওষধি মূল্য নিয়ে সচরাচর তেমন কোনো আলাপ-আলোচনা হয় না। আজকাল মালিশ চিকিৎসা, জল চিকিৎসা, সুগন্ধি চিকিসা, স্পর্শ চিকিৎসা, কম্পন চিকিৎসা ইত্যাদি নানাবিধ চিকিৎসার প্রসার দেখতে পাই। এর পাশাপাশি হাস্যরসেরও চিকিৎসা গুণ রয়েছে। হাসলে কিংবা হাসালে চিত্ত প্রফুল্ল হয়, মন উদ্দীপ্ত হয়, বিষণ্ন বিপর্যস্ত ব্যক্তি বাঁচার আনন্দ খুঁজে পায়। হাসি খুশি ব্যক্তি, সুস্থ ব্যক্তি। অবশ্য হাস্য-গবেষকগণ এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না আসলে হাসিই মানুষকে সুস্থবোধ করতে সাহায্য করে, নাকি এর পেছনে আরো অন্য কোনো কারণ রয়েছে। যারা হাসেন, তাদের রসবোধ প্রখর হয়; তারা জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। হাসি-খুশি ব্যক্তিকে বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবার-পরিজনেরাও পছন্দ করেন। হাসি-খুশি ব্যক্তির সাহচর্যে এসে কেউ গোমরা হয়ে বসে থাকতে পারেন না। হাসির এত উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও দুঃখের বিষয় এ নিয়ে তেমন কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি।

হাসলে শরীরে কী ঘটে?

হাসলে শরীরে নানা রকম শারীরবৃত্তিক পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে মুখমণ্ডল ও শরীরের পেশি প্রসারিত-সংকুচিত হয়, হৃদঘাত এবং রক্তচাপ পরিবর্তিত হয়, শ্বাসের গতি বেড়ে যায় এবং আমাদের শরীরের সর্বত্র অতিরিক্ত অক্সিজেন প্রবাহিত হয়। অনেকে বলেন হাসি এবং ব্যায়ামের উপকারিতা একই রকম। হাসির পাশাপাশি যদি কেউ হাল্কা শরীরচর্চা করেন, তাহলে তারা আরো উপকৃত হবেন। যারা ঘরে ব্যায়ামের যন্ত্র দিয়ে শরীরচর্চা করেন তাদের হৃদস্পন্দন ১০ মিনিটে যতটুকু বাড়ে, ১ মিনিটের প্রাণখোলা হাসিতেও সমপরিমাণ হৃদস্পন্দন বাড়ে। হাসলে প্রচুর ক্যালরিও খরচ হয়। হিসেব করে দেখা গেছে ১০-১৫ মিনিটের হাসির ফলে ৫০ ক্যালরি খরচ হয়। এই হিসেব দেখে তাই বলে কেউ যেন শরীরচর্চা ছেড়ে না দেন। একটি চকোলেট খেলেও আমরা ৫০ ক্যালরি পাই। প্রতি ঘণ্টায় ৫০ ক্যালরি খরচ করে আমরা যদি ১ পাউন্ড ওজন কমানোর জন্য চেষ্টা করি, তাহলে আমাদের পুরো ১ দিন হাসতে হবে। বিগত কয়েক দশকের গবেষণায় শরীরের ওপরে হাসির প্রভাব সম্পর্কে আরো কিছু চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে।

রক্তপ্রবাহ

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ একটা মজার গবেষণা করেছেন। কাউকে কমেডি নাটক বা দুঃখের নাটক দেখতে দিলে তাদের রক্ত প্রবাহের ওপর কেমন প্রতিক্রিয়া হয়, তারা গবেষণার মাধ্যমে সেটাই পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলাফল যা ভাবার তাই হয়েছে। যারা হাসির নাট দেখেছেন তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত প্রবাহ বেড়েছে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

অতিরিক্ত মানসিক চাপ কিংবা উদ্বেগ, আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। কিন্তু কিছু পরীক্ষা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, হাস্যরস শরীরে রোগ প্রতিরোধের জন্য দরকারি কোষ এবং অ্যান্টিবডির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।

রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ

ডায়াবেটিসের রোগীদের ওপর হাসি তামাশার প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণা হয়েছে। এর ফলাফলও বেশ মজার। বলা হচ্ছে হাসি-তামাশা রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমানোর জন্য সহায়ক।

শিথিলায়ন এবং ঘুম

নরমান কাজিন নামে এক ভদ্রলোক একটি বই লিখেছেন। মূলত তার বইটি হাসির উপকারিতা সম্পর্কে চিকিৎসা গবেষখদের প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাজিনের এক ধরণের বাত হয়েছিল যার ফলে শিরদাঁড়া এবং কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। উনি অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন ওষুধ সেবনে তার যত না উপকার হতো, তারচেয়ে বেশি উপকার পাওয়া যেত কোনো হাসির সিনেমা দেখলে। উনি বলেছেন দশ মিনিট হাসতে পারলে দু ঘণ্টা আরামে ঘুমানো যেত।

হাসি এক অমূল্য ওষুধ

হাসির উপকারিতা নিয়ে কোনো সন্দেহ না থাকলেও গবেষকগণ এর প্রকৃত রহস্য উদ্ধার করতে গিয়ে পড়েছেণ এক গোলক ধাঁধায়। কারণ হাসিসংক্রান্ত গবেষণাগুলোর পরিসর ছোট এবং তেমন নির্ভরযোগ্য ও গোছানো নয়। অনেক গবেষখ আগে থেকেই হাসির ইতিবাচক দিক প্রমাণের জন্য পক্ষপাতমূলক কাজ-কর্ম করেছেন। ফলে হাসির উপকারিতা সম্পর্কে নিরপেক্ষ বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া কঠিন। সবচেয়ে বেশি তথ্য পাওয়া যায় ব্যথা নাশক হিসেবে হাসির ভূমিকা নিয়ে। অনেক গবেষণায় প্রমাণ করা হয়েছে হাসলে আঘাতজনিত ব্যথার অনুভূতি অনেক কমে যায়। অবশ্য এটা কি শুধু হাসির প্রভাব, না আর কোনো উপাদান এখানে কার্যকর তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেমন বলা হচ্ছে হাসলে মানুষের অসুস্থতার হার কমে যায়। নাকি যারা সুস্থ তারা বেশি হাসতে পারেন? এ জন্য হাসিই সুস্থতার নিয়ামক নাকি, সুস্থতার ফল হাসি তামাশা-এ প্রশ্নের জবাব দেয়া সহজ নয়।

উন্নত জীবনের জন্য হাসি

একথা অনস্বীকার্য হাসি সামাজিকায়নের চাবিকাঠি। হাসি স্বর্গীয়। হাস্যরসিক ব্যক্তি বন্ধুবৎসল, পরিবার-পরিজনবেষ্টিত সুখী মানুষ। এটা হাসির কারণে নাকি সুখী পরিবারের ফসল হাসি, তা নিয়ে অযথা বিতর্ক না করে, আমরা সকলের মুখে হাসি চাই। নিঃসঙ্গ ব্যক্তির চেয়ে বন্ধু-বান্ধব পরিবৃত্ত ব্যক্তি ৩০ গুণ বেশি হাসেন। যারা হাসেন তাদের সঙ্গে আশপাশের মানুষের সংযোগ অধিকতর ঘনিষ্ঠ। স্বাস্থ্যের ওপর এ সবের ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে।

হাসি স্বাস্থ্যকর। কিন্তু আমরা শুধু বাঁচার জন্য হাসি না। পরিবার প্রিয়জনের সঙ্গে হাস্যময় আন্তরিকতা আমাদের আত্মিক বন্ধনকে দৃঢ় করে; কেন করে তা অনুসন্ধান হাসি গবেষকগণ করতে পারেন। হাসি যদি আমরা উপভোগ করি তো সেটাই কি হাসির জন্য যথেষ্ট কারণ নয়? এর জন্য কি চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের দরকার আছে?

রক্তচাপের দৈনিক ছন্দ

–        ডাঃ এ, আর, এম, সাইফুদ্দীন একরাম

পৃথিবীতে সব কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম এবং ছন্দ মেনে চলে। রাতের পরে দিন আসে, দিনের পরে রাত। সাগরে নির্দিষ্ট নিয়মে জোয়ার ভাটা আসে, বাৎসরিক ঋতুচক্রেও আমরা দেখি ছন্দময় চক্র। তেমন আমাদের দেহ ঘড়িতেও রয়েছে ছন্দ। হৃদ ঘাত, নাড়ির গতি কিংবা ঘুমের মতো রক্তচাপেরও একটি দৈনিক ছন্দ রয়েছে। সাধারণত রাতে ঘুমের সময় রক্তচাপ কম থাকে। কিন্তু ভোরে ঘুম থেকে ওঠার ঘণ্টা খানেক আগে থেকে রক্তচাপ বাড়তে থাকে।  দিনের বেলা রক্ত চাপ বাড়তে থাকে এবং বিকেল বেলা এটা সব চেয়ে বেশী থাকে। বিকেলের পর থেকে রক্তচাপ আবার কমতে থাকে। কারও রক্তচাপের ছন্দে  অস্বাভাবিকতা থাকলে (যেমন সকাল বেলা যদি রক্তচাপ বেশী থাকে), তার অন্তর্নিহিত কোন গুরুতর ব্যাধি থাকার আশঙ্কা বেশী থাকে।

সাধারনত নানারকম অসুখের কারণে এরকম হতে পারে । কারও রক্তচাপ দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত থাকলে তার রক্তচাপের নিয়মিত ছন্দ বিঘ্নিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রক্তচাপের কোন কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নানা রকম গুরুতর ব্যাধির কারণে এমন হতে পারে। যেমন- কিডনির রোগ, শরীরে হরমোনের সমস্যা, মস্তিষ্কের কিংবা অ্যাড্রেনাল গ্রন্থির টিউমার ইত্যাদি। এছাড়া রক্তচাপের ওষুধ নিয়মিত সেবন না করলেও এমন হতে পারে।

অনেকের রাতে ঘুমের মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে।একে নিদ্রাজনিত শ্বাস-আবদ্ধতা বলা হয়। এভাবে রাতে মাঝে মাঝে শ্বাস বন্ধ থাকার কারণে রক্তে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং ফুসফুসের রক্তনালির চাপ বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন হতে থাকলে এদের উচ্চরক্তচাপ হওয়ার প্রবণতা থাকে। এছাড়া এধরনের সমস্যার জন্য রাতের ঘুম বিঘ্নিত হয় এবং দিনে তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব থাকে এবং শারীরিকভাবে অবসন্ন বোধ হয়।

রক্তচাপের ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ার পেছনে অনেক ঝুঁকি উপাদান কাজ করে। যেমন-

  • রাতের শিফটে কাজ করা – মনে করা হয় যারা দিনের শিফটের  পরিবর্তে রাতের শিফটে কাজ করেন তাদের ঘুমের স্বাভাবিক চক্র বিঘ্নিত হয়। এদের এক পর্যায়ে রক্তচাপের ছন্দ বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
  • ক্যাফেইনের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলেও রক্ত চাপের ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে।
  • অতিরিক্ত বিড়ি, সিগারেট, তামাক ইত্যাদি  সেবন করলে রক্তনালি সঙ্কুচিত হয় এবং রক্তচাপ বেড়ে যায়। এভাবেও রক্তচাপের দৈনিক ছন্দ বিনষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • অতিরিক্ত উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, মানসিক অশান্তির কারণে রক্তচাপের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হতে পারে।

উচ্চরক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উচ্চরক্তচাপের কোন লক্ষন-উপসর্গ থাকে না।  সাধারণত উচ্চরক্তচাপের রোগীদের গুরুতর জটিলতা হওয়ার পরে অতিরিক্ত রক্তচাপের বিষয়টি শনাক্ত হয়। তেমন রক্তচাপের দৈনিক ছন্দ বিঘ্নিত হলেও তা দীর্ঘদিন চাপা থাকতে পারে । একমাত্র এর ফলে জটিলতা হলেই তা শনাক্ত হয়। আর সাধারণ পরীক্ষা নিরীক্ষার দ্বারা এটা শনাক্ত করাও যায় না। এজন্য ২৪ ঘণ্টা রক্তচাপ পর্যবেক্ষণ করলে রক্তচাপের দৈনিক ছন্দে কোন সমস্যা আছে কিনা , তা বের করা হয়। অতএব কারও রক্তচাপের ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে তার সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে এবং এজন্য চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে।